স্যর তারাপদ রায় // বিমোচন ভট্টাচার্য

দু হাজার সালে আমাদের সল্টলেক ব্রাঞ্চ ওপেন হয়। আগের কুড়িদিন আর পরের কুড়িদিন আমাকে ওখানে ডেপুটেশনে পাঠানো হল। ওপেন হল ব্রাঞ্চ। কিন্তু আমি ফিরে এলাম আমার পুরোনো ব্রাঞ্চে। দু হাজার তিন-এ আবার আমাকে ওখানে পাঠানো হল। কাজ করছি। আস্তে আস্তে কাস্টমারদের সংগে পরিচিত হচ্ছি। একদিন একজনকে লকার খুলে দিয়ে ফিরে দেখি আমার টেবিলের সামনে একজন ভীষন মোটা লোক বসে। বেশ কালো। সামনে এসে নিজের চেয়ারে বসে দেখি লাল চোখে তিনি আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। কেউ না কেউ আমার পিতৃপরিচয় দিয়ে দেয়ই, সেই আমার ছোটবেলা থেকে। একটি ছেলে এসে সেই ভদ্রলোককে বললেন, “বাসুদা কিন্তু খুব নামী লোকের ছেলে। বলে আমার বাবার নামটি বলে দিল তাঁকে। তিনি সেইরকম লাল চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছেন তখনও।” আমি ভয় পাওয়ার ভঙ্গি করে তাঁকে বললাম, “অমন করে তাকিয়ে আছেন কেন? আমার বাবা কি আপনার কাছে টাকা ধার করে ফেরত দেননি নাকি?”
হো হো করে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। হাসলে ওঁর ভুঁড়িটা প্রথমে হাসত, তারপর ওঁর মুখ। বললেন, “দিস প্রুভস দ্যাট ইউ আর হিস সন। আপনি জানেন নিশ্চয়ই যে আপনার বাবাকে ‘মধুসংলাপী’ বলা হত?” সেই আমার সংগে প্রথম দেখা তারাপদ রায়ের।
ব্যস, তারাপদ রায়, আমার অন্যতম প্রিয় লেখক, কবির সংগে জমে গেল আমার। শনিবার আসতেন ব্যাঙ্কে।লকার খুলতেন, বলতেন, “এত কী কাজ করো? বোসো আমার পাশে। শোনো, তোমার কাজ হচ্ছে দেখা আমি যা যা বার করলাম লকার থেকে, সেগুলি আবার যথাস্থানে রাখলাম কিনা। মিনতির (ওঁর স্ত্রী) ধারণা আমার হাতেই একদিন লকার শুন্য হবে। বলতেন, “যা লিখি সবই তো পড়ো তোমরা। বোধ হয় আমার লেখার আগেও পড়ো। তোমাকে কিছু অরিজিনাল শোনাব।” শোনাতেনও।
একদিন বললেন, “এক ছেলে স্কুলের সামনে খুব গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী রে, এত গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে কেন? ছেলেটি করুণ মুখে বলল, “আজ স্কুলের রেজাল্ট আউট, আমার মনে হচ্ছে একজন প্রোমোটার লাগবে।” একদিন আমি বললাম, “স্যর, আমার সবচেয়ে ভাল লাগে আপনার কবিতা।” উত্তর দিলেন, “তুমি আমার কবিতা পড়েছ?” আমি দু-তিনটে কবিতা বলে দিলাম। বললেন, “আমার কবি বন্ধুরা বলে, আমি নাকি কবিতা লিখতেই পারি না।” সেই একদিনই আমি ‘স্যর’-এর গলায় অভিমান পেয়েছিলাম।
এক রবিবার আনন্দবাজারের রবিবাসরীয় তে লিখলেন ‘কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি’। পড়েই ফোন করলাম স্যরকে। বললাম, “স্যর, আমি এ দেশের লোক, চোখে জল এসে গেল পড়ে, কী করে লেখেন এমন? এত মায়া এখনও ওই ফেলে আসা দেশের জন্যে?” বললেন, “কী যে বলো! তবে তোমার ভালো লেগেছে জেনে আমারও ভাল লাগল।” পরের শনিবার এলেন। এক গোছা চেক নিয়ে। সব আমি লিখে দিতাম। বললেন, “আশ্চর্য কী জানো? কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ির জন্যে যত ফোন পাচ্ছি অধিকাংশ পাঠকই এ পারের!”
একদিন বললেন, “অফিস ছুটির পর একদিন এসো। খেয়েদেয়ে যেও। মিনতি খুব ভাল রান্না করে। তোমার প্রিয় লেখক (সন্দীপন, বলেছিলাম কথায় কথায়) ওর রান্না খুব পছন্দ করে। আমার বাড়িতে স্কচ সব সময় থাকে। দুজনে আকন্ঠ খেয়ে সাহিত্য আলোচনা করব।” আমি মদ্যপান করি না শুনে আবার অনেকক্ষণ সেইভাবে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, “তুমি বিধায়ক ভট্টাচার্যের ছেলে? মাল খাও না? আরে তোমার বাবার সাথে মাল খেয়েছি আমি। বাপ ছেলে দুজনের সঙ্গেই মাল খাওয়ার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনে ব্যর্থ হবার জন্যে আমি তোমাকে ক্ষমা করব না দিলদার।” হুড়হুড় করে কথা বলতেন। মাঝে মাঝে থামতেন। একটা কথা দুবার বলা অভ্যেস ছিল। এমন করেই কাটছিল শনিবারগুলো।
একদিন ওঁর একটি কবিতা পড়লাম।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখি।
চুল আঁচড়াই, দাড়ি কামাই,
কখনো নিজেকে ভাল করে দেখি,
ফিসফিস করে নিজেকে জিজ্ঞাসা করি,
‘কেমন আছ, তারাপদ?’
কখনও কখনও নিজেকে বলি,
‘ছেষট্টি বছর বয়েস হল,
যদি এর অর্ধেক জীবন বাঁচো,
শতায়ু হবে।’
নিজের রসিকতায় নিজেই হাসি
নিজে অর্থাৎ আমি নিজে এবং আয়নার নিজে।
এইরকম ভাবে একদিন,
কথা নেই, বার্তা নেই আয়নার নিজে,
কী কৌশলে আয়না থেকে বেরিয়ে আসে।
আমি তাকে বোঝাই, ‘এ হয় না, এ হতে পারে না।’
সে আমাকে বোঝায়, ‘এ হয় না, এ হতে পারে না।’
আয়নার সামনে এরকম কথা কাটাকুটি হতে হতে
হঠাৎ সে আমাকে এক ধাক্কায়
আয়নার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়।
তারপর থেকে আমি আয়নার ভেতরে।
আর যার সঙ্গে আপনাদের কথাবার্তা, চলাফেরা,
সেই তারাপদবাবু কেউ নন,
তিনি আমার ছায়া।
কবিতার নাম ‘তিনি আমার ছায়া’। পড়েছেন এমন কবিতা ইতিপূর্বে, পাঠক? একমাত্র তারাপদ রায়ই পারেন এমন কবিতা লিখতে। পরে জিজ্ঞাসা করেছিলেম, “অনেকদিন তো হয়ে গেল, এবার বার করে দিন আসল তারাপদবাবুকে।” হাসতেন। বলতেন, “থাক ব্যাটা আয়নার ভেতর। তবে কী জানো, রাত্তিরে যখন মাল খাই, ব্যাটা করুণ মুখে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। বড় কষ্ট হয় তখন। গেলাসে ঢেলে আয়নার সামনে রেখে দিই। ও বাবা, সকালে উঠে দেখি গেলাস ফাঁকা। কোন ফাঁকে মেরে দিয়েছে ব্যাটা।” তারপর একটু হেসে বলতেন, “আমিই আসলে ওর নাম করে আর এক গ্লাস মেরে দিই রোজ।”
এমনি করেই দিন কাটত সুখে। শনিবারের জন্যে অপেক্ষা করতাম আমি। কোনও শনিবার উনি না এলে আমি ফোন করতাম। আমি না এলে উনি।
ওঁর শ্যালক আসতেন ব্যাঙ্কে। উনিই আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি একদিন এসে বললেন, স্যর অসুস্থ। পিজি-তে ভর্তি। একদিন বিকেলে সেই শ্যালকের ফোন, “জামাইবাবু আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।” বললেন, “অনেকদিন তোমার সঙ্গে কথা হয় না। একদিন এসো। এরা এখন আমায় ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। তুমি হাসপাতালেই এসো একদিন।” বললাম, “যাব স্যর, নিশ্চয়ই যাব।”
কিন্তু জানেন, যাইনি আমি।কুঁড়ে আমি, অপদার্থ আমি যাই নি। শেষ দেখা হয়নি আমার স্যরের সঙ্গে। খুব খারাপ লাগে জানেন। ওঁর আর একটা কবিতার প্রথম আর শেষ কয়েকটি লাইন পড়ুন, দু হাজার আট সালে লেখা। দীর্ঘ কবিতা, না হলে পুরোটাই দিতাম। কবিতার নাম ‘রবার
জীবন এত লম্বা হবে তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি’।
পঁয়ষট্টি, ছেষট্টি, সাতষট্টি আটষট্টি… আটষট্টি….
জীবনের রবার ভদ্রলোক টানছেন, টানছেন
টেনে যাচ্ছেন।
কম কথা নয়
ভেবে দেখলে পঁচিশ হাজার দিন পার হয়ে গেছে
পঁচিশ হাজার সুর্যাস্ত ও সুর্যোদয়,
আটশো মাস, কয়েকশো কালবোশেখী
সাড়ে তিন হাজার রবিবার
একটা মন্বন্তর, একটা মহাযুদ্ধ, একটা পার্টিশন
কয়েকটা দাঙ্গা, কয়েকটা বিজয় মিছিল।
এই কবিতার একেবারে শেষে লিখছেন…
বৃষ্টি ও কুয়াশাভরা শেষরাতে
অশোকনগর, দিল্লী, ঢাকা, ম্যানহাটান, বার্কলে, সিঙ্গাপুর
এলাসিন, টাঙ্গাইল, এসপ্ল্যানেড,কালিঘাট, পন্ডিতিয়া, থিয়েটার রোড
এক অলৌকিক নোয়ার নৌকো, কিছুটা স্টিমার, ট্রেন,বিমান মেট্রোরেল হয়ে অটোর মতো এঁকেবেঁকে ভিড় কাটিয়ে
লবণহ্রদের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ায়
খুব চাপা কন্ঠে কে যেন ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলে,
বড়বাবু জানতে চেয়েছেন,
রবার কি আরও টানতে হবে।
ফিসফিস করে প্রশ্ন করে,
ওহে, এইচ-এ পঞ্চান্ন
ভেবে দেখেছো
কতদুর এসে গেছ? কতদুর?
ভাবতে পারেন? স্যর কি বুঝতে পেরেছিলেন যে রবার আর টানা হবে না? না হলে এমন কবিতা লিখবেন কেন?
চলে গেলেন তারাপদ রায়। ওঁর পারলৌকিক কাজে ওঁর এইচ এ পঞ্চান্নয় গিয়েছিলাম আমরা। সেখানে সেদিন চাঁদের হাট! কে নেই? ওঁর শোবার ঘরে ওঁর শেষ কাজ করছিলেন ওঁর একমাত্র ছেলে কৃত্তিবাস। উঠে এসে আমাদের সঙ্গে কথা বললেন তিনি। আর আমার চোখ পড়ল ঘরের ভেতর সেই বিরাট আয়নার ওপর। ছাঁত করে উঠল বুকের ভেতর। আয়নার ভেতর থেকে আসল তারাপদবাবু আমাদের দেখছেন না তো? বলছেন না তো সেই জলদগম্ভীর গলায়, “কি হে, ভটচাজ, সেই এলে, পি জি তে দেখা করতে এলে না?”
কৃত্তিবাস আবার কাজে বসলেন, আর আমরা ফিরে চললাম চুয়ান্নটি বাড়ি আগে আমাদের ব্যাঙ্কে, এইচ এ ওয়ানে। 
তারপর থেকে শনিবারগুলো বড় শূন্য শূন্য লাগত। যতদিন না রিটায়ার করেছি আর কী।
স্যর, আমার অনেকদিন ইচ্ছে করেছে আপনাকে একটা প্রণাম করি। আপনি করতে দেননি। আজ আপনাকে এই লেখার মধ্যে দিয়ে একটা প্রণাম জানালাম। নিলেন কি?

বিমোচন ভট্টাচার্য

https://www.facebook.com/bimochan.bhattacharya/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *