মানবতার হত্যাকারীদের জন্যে // কুলদা রায়

আমার বন্ধু শামিম আহমেদ দর্শনের অধ্যাপক। অসামান্য কথাশিল্পী। একই সঙ্গে ধর্ম, ইতিহাস, পুরাণ, রাজনীতি বিষয়ে সুপণ্ডিত। তিনি যেমন মহাভারত নিয়ে বই লিখেছেন, আবার কারবালার এজিদকেও নিয়েও লিখেছেন। তথ্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য সত্যের সমাহার থেকে প্রকৃত সত্যের সন্ধান করেন। সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতে ভয় পান না।

শামিম যখন একজন নিপীড়িত মুসলমানের পক্ষে কথা বলেন, তখন একজন মানুষ হিসেবে একজন নিপীড়ত মানুষের পক্ষে কথা বলেন। ফলে শামিমের কথা শুধু নিপীড়িত মুসলমানদের পক্ষেই যায় না, নিপীড়িত হিন্দুর পক্ষেও যায়। নিপীড়ত বৌদ্ধে বা শিখদের পক্ষেও যেতে পারে। নিপীড়কের যেমন জাত হয় না, তেমনই নিপীড়িতেরও কোনও জাত হতে পারে না।

এজন্যই শামিম আহমেদ আমার বন্ধু। কিছুদিন আগে আমি লিখেছিলাম। আজ লিখেছেন শামিম।


”অতি প্রাচীন কাল থেকে গো-মাংস ভক্ষণের বহু উদাহারণ পাওয়া যায়। মহাভারতেও বেশ কয়েকটি জায়গায় গো-মাংস ভক্ষণের উল্লেখ করা হয়েছে। ধার্মিক রাজা রন্তিদেবের উপাখ্যানে বলা হয়েছে যে, তিনি প্রত্যহ দু হাজার গরু বধ করতেন এবং সেই মাংস দান করতেন। এই গো-মাংস দানের ফলেই রন্তিদেবের কীর্তি বিস্তৃত হয়েছে। (বনপর্বঃ ১৯৬/২১, ২০৭/৯)। আর চর্মন্বতী (চম্বল) নদীর কথা সকলেই জানেন।

বনবাসের উদ্দেশে রাম সীতা আর লক্ষ্মণ যখন ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে উপস্থিত হন, তখন মুনি তাঁদের ষাঁড়ের মাংস আর ফল দিয়ে সেবা করেন (বাল্মীকি রামায়ণ ২/৫৪)।
মহর্ষি পাণিনি মেনেছেন।
স্মৃতিশাস্ত্রে গো-মাংস ভক্ষণের সমর্থন পাওয়া যায়।
কৌটিল্য মেনেছেন।
গৃহ্যসূত্রগুলির সুরও তাই।
আয়ুর্বেদ কী বলে?

চরক এবং সুশ্রুত। চরক বলছেন – গো-মাংস বাত, নাক ফোলা, জ্বর, শুকনো কাশি, অত্যাগ্নি (অতিরিক্ত ক্ষুধা বা গরম), কৃশতা প্রভৃতি অসুখের প্রতিকারে বিশেষ উপকারী (চরকসংহিতা ১/২৭/৭৯)। সুশ্রুতও একই সুরে বলেছেন – গো-মাংস পবিত্র এবং ঠান্ডা। হাঁপানি, সর্দিকাশি, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অতি ক্ষুধা এবং বায়ু বিভ্রাটের নিরাময় করে (সুশ্রুতসংহিতা ১/৪৬/৪৭)। ”


আমার একটু সংযোজন।

গোমাংস খাওয়ার অপরাধে যদি কোনও মানুষকে মেরে ফেলতে হয়, তাহলে একই অপরাধে তাবৎ হিন্দুদের পূর্বপুরুষকে আগে মেরে ফেলতে হবে। গরু যেমন দেবতা, মাছও তেমন হিন্দুদের দেবতা। ‘মাছ দেবতা’কে খাওয়ার অপরাধে তাবৎ হিন্দুদেরকে মেরে ফেলতে হবে।

নিজের ছোট মেয়েটির সামনে যে লোকটিকে মেরে ফেলা হল গরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে, আর লক্ষ্মীপূজায় বাজি ফাটানোকে কেন্দ্র করে যে পেটের শিশুটিকেও মেরে ফেলা হল তার মায়ের পেটে লাথি মেরে — এই দুটি মানুষের হত্যাকারীই মানবতার বিরুদ্ধে সমান অপরাধ করেছে।

কুলদা রায়

https://www.facebook.com/porimanob/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *