দুই মেয়ের গল্প // সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়

দুটো মেয়ের গল্প বলেছি এর আগে ? হাই সেকেন্ডারি পাশ করার পর, অনেক অনেক টিউশন করতাম। না, প্রয়োজনে নয়। তীব্র একটা প্যাশন থেকেই পড়াতাম। নানান রকম ছাত্র ছাত্রী পড়িয়েছি সে সময়। এক জায়গায় পড়াতে যেতাম যারা মূলত ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার। খুব গরীব ঘর থেকে আসত তারা। ছেলেগুলো সকালে কাগজ দিত, কিংবা স্কুলের পরে দোকানে কাজ করত, সন্ধেবেলা ক্লাসে এসে ঢুলত। কারও বাড়িতে ইলেক্ট্রিসিটি কেটে দিয়েছে টাকা দিতে পারেনি বলে।

এখনও মনে আছে, সায়ন বলে একটি ছেলের কথা, রোজ পড়তে পড়তে উঠে বলত, “আন্টি একটু মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসছি।” ভাবতাম, ছোট্ট, মন খারাপ করে বুঝি। দু-তিনদিন পর আর যেতে দিতে চাইছি না, তখন খোঁজ নিয়ে জানলাম, ওর মা আয়ার কাজ করেন, এখন দেখা না হলে আর সারাদিনে দেখা হবে না। তারপর একদিন সায়ন আর এল না। বাকিরা বলেছিল, “আন্টি, ওর বাবা-মা-র মধ্যে খুব ঝগড়া হয়েছে, সায়নকে নিয়ে ওর মা চলে গেছে।” “সে কী রে! ওর স্কুল?”… কে জানে! জানি না আর সায়নের গল্প। তখন আমি সেকেন্ড ইয়ার হব হয়তো। ছেলেগুলো ব্যাগ রেখে পালিয়ে যেত খেলতে, হোমওয়ার্ক করত না। খুঁজে খুঁজে উলটো দিকের বস্তিতে গিয়ে একবার ধরে এনেছিলাম ছেলেগুলোকে। ছেলেমেয়েদের মাথা খাওয়াটা প্রায় নেশার মতো। যার আছে, সে জানে। বাড়িতে এক সময় অনেক ছাত্র-ছাত্রী আসত। শনি-রবিবার সকালবেলা বাইরের ছোট্ট ঘরটায় জায়গা থাকত না আর! মা-রা দাঁড়িয়ে থাকতেন বাইরে। আর অন্য একদিন ছিল টেন-এর একটা ব্যাচ। তারপর আসতে আসতে নানান রকম অন্য কাজকর্মের চাপ বাড়ায় ছেড়ে দিলাম সব…

শুধু আমাকে কিছুতেই ছাড়ল না দুটি মেয়ে। নিয়মিত যেতে পারি না ভবানীপুর, আগের মতো অত খেটে পড়াতেও পারি না বলে আমার ধারণা। কিন্তু তবু তারা আসে। নাহ! টিউশনের কোনও লেনদেনই আমাদের মধ্যে নেই, পড়াশোনা আর ভালোবাসা ছাড়া। একটি এ বছর টুয়েলভ পাশ করবে, বিড়লা হাই ফর গার্লস থেকে, অন্যটি নাইন, বিদ্যা ভারতী। মজা হল, অনেক বছর আগে দুটোই যখন এসেছিল, কারোরই ইংরিজি ভালো লাগত না, কোনওরকম সাহিত্যই না। আর এখন দুজনেই অনেক অনেক বই পড়ে, আমিও পড়িনি সব। আমাকে এসেই লিস্ট বানিয়ে দেয় , কী কী পড়তে হবে। মা-বাবা তো বটেই, সঙ্গে এই দুটোর নেশাতেও ভবানীপুর যাই, প্রতি সোমবার। অফিসের পর খুব ক্লান্ত লাগে। কিন্তু ওদের ওই মন খারাপের গলাটা শুনব না বলে ছুট্টে যাই। ছোটটি ভারি গায়ে পড়া… সে আমাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। পরের বছর থেকে আর যেতে পারব না নিয়মিত এ কথা বলায়, ফুঁপিয়ে কেঁদে বলেছিল, “তবে কি তোমার সঙ্গে আমার আর দেখাই হবে না আন্টি? কাকে বলব আমি সব কথা? মা-বাবা যে বোঝে না।” “কী কথা বলবি তুই?” “সব। যা আমার মনে হয়, যা আমার প্রশ্ন”… ওর বাবাকে বুঝিয়ে বললাম। অন্য কোথাও দিতে। ওর বাবা ও বললেন, “ও পড়বে না কারও কাছে। আপনি যদি কখনও আসেন… একটু বুঝিয়ে দেবেন, তাহলেও হবে।” আমি কোনওদিনও স্কুলে র‍্যাঙ্কার ছিলাম না। জীবনেও না। তবু কিছু কিছু ভালোবাসা, ভরসা, এত বেশি হয়… যে ভয় করে! ও আমায় ফোন করে জিগ্যেস করে, “সারাদিন পড়তে ইচ্ছে করছে না আন্টি, কী করব?” “ছবি আঁক না।” “আচ্ছা।” পরেরদিনই নিয়ে আসবে একটা চমৎকার আঁকা। সঙ্গে আবার নিয়ে আসে, অনেক গান, খুঁজে খুঁজে কবিতা, যা নাকি আমাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। ওরা বলে, “একদিন তোমার বাড়ি যাব,তুমি কথা বলবে, আমরা শুনব।” খুব হাসি পায় আমার… সারাজীবন শুনে এসেছি, আমি ভীষণ কথা বলি, তা কেউ সাধ করে শুনতে চাইছে নাকি! একদিন স্কুল থেকে শ্রেষ্ঠা খুব মন খারাপ করে এল — “তুমি যে বলো, আমরা পড়শোনা করি জানবার জন্য, শেখবার জন্য?” “বলি-ই তো।” “স্কুলের আন্টি যে বলল আমরা পড়াশোনা করি চাকরি পাওয়ার জন্য।” সেদিন ওর গলায় খুব অভিমান — “তুমি যা বলো, তা কেন আর কারও কথার সঙ্গে মেলে না আন্টি। আমি বললেও কেউ শোনে না, বন্ধুরাও না।” সত্যি তো। আমি বোধ হয় ওদের এমন কিছু বলে ফেলি, যা ওরা মেলাতে পারে না… কী করব। বললাম, “আমি যা বলি, তা ক্লাসের বাইরে ভুলে যাস, ওগুলো হয়তো সত্যি না। ওগুলো আমি ভাবি।” দুজনেই বলল, “আর কক্ষনও বলবে না ওগুলো সত্যি না।” আচ্ছা বলব না…

ওরা আমার জন্মদিনে চিঠি লেখে, হাতে লেখা চিঠি। ওরা আমার জন্য হাতে করে ফুল বানায়… ফোন করে একটু আগে জিগ্যেস করল, “অংকে একদম মন বসছে না আন্টি, কী করব?” “আমি কী করে বলব রে? আমি কি অঙ্ক জানি?” “তুমি একটু বলো কীভাবে মন বসবে। সেটা করি।” খুব ভয় করে আমার, বুকের ভিতর টিপটিপ করে… এত ভরসা কীভাবে সামলাই? বললাম, “নতুন খাতা আছে রে বাড়িতে? একবার নতুন সাদা পাতায় শুরু করে দেখবি? মনে হচ্ছে হবে…” “আচ্ছা, তাহলে অঙ্ক করতে বসি।”

হঠাৎ মনে পড়ল, সুগতর কথা…ও আমার অর্কুট বন্ধু ছিল। এক বয়সি। আমার বান্ধবীর বন্ধু। দারুণ গান গাইত, ইংরিজিতে কবিতা লিখত। আই এস আই-তে চান্স পেয়েছিল, কিন্তু আসলে ইংরেজি পড়তে চাইত। আমাকে বলত, যে কবিতা লিখতে পারে, সে অঙ্ক পারে না হতেই পারে না। তুই চেষ্টাই করিসিনি। পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর কবিতার নাম অঙ্ক। আর বলত, “তুই একটা গাছের ফুটো, আর তোর কবিতারা একটা হলুদ বেলুন।”

একদিন খবর এল… সুগত আর নেই, টেবিল টেনিস খেলে, হোস্টেলের ঘরে ঢুকে সুগত আত্মহত্যা করেছিল, চিরকুটে লিখে গেছিল ‘ভালো লাগছে না’।

আমার সঙ্গে সুগতর দেখা হয়নি কখনও। তবু মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখতে পাই ওকে… দূরে একটা হলুদ বেলুন হাতে সুগত ওড়ে… ইয়ং মাইন্ডকে আমি খুব ভালোবাসি আর ভয় পাই… আর সেরকম কোনও কচি মাথা আমার ওপর ভরসা করছে ভাবলে অনেকটা দায়িত্ব বেড়ে যায়। কোনও কচি হাত যা আমায় ছুঁতে চাইছে আমি যেন কখনও তাকে দূরে না ঠেলি… কখনও না দায়িত্বহীনের মতো কাজ করি… খুব বাউন্ডুলে, অগোছালো হতে হতেও, ওদের মুখগুলো সামলে নেয় আমায়… কারণ? ভরসা। সেদিন সুগতর সঙ্গে যদি দেখা হত, হয়তো পারতাম পৃথিবীতে ভালো লাগার মতো কিছু তাকে দেখাতে… পারিনি!

সারাজীবন ধরে তাই যেন অন্য অনেক সুগতদের সুগতাদের দেখাতে পারি… পৃথিবীর রঙিন কিছু দিক… যাতে আর কেউ না বলে ‘ভালো লাগছে না’… যাতে আর কেউ বাড়িয়ে দেওয়া একটা ভরসার হাতের অভাবে , অনেক অভিমানে চলে না যায়…

সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়

https://web.facebook.com/samragnee.banerjee.1

One Comment

  1. মনে হল কোনো নির্জন স্রোত কথা বলে চলেছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *