ঈশ্বরীর জন্যে // সৈকত মুখোপাধ্যায়

আকাশে তারার মৌচাক ভেঙে গেছে। নিচে ছলছল করছে ভাগিরথীর জল। পুবপাড়ে পানিহাটির শ্মশানে দুটো চিতার আগুনের টিপ। আর এই পশ্চিমকূল, বারানসীসমতুল, তার মধ্যে উত্তম উত্তরপাড়া গ্রাম।

সেই বালক দাঁড়িয়ে আছে ঘাটের রানার একপাশে। তাদের পাড়ার প্রতিমাকে বিসর্জনের জন্যে নিয়ে আসা হয়েছে। তিন-চারটে হ্যাজাকবাতির আলোয় সে দেখছে বড় দাদাদের কাঁধে চেপে প্রতিমা ঘুরছে — একবার দুবার তিনবার… তারপরেই জয় মা, মাগো। সমবেত জয়জোকারের মধ্যে জলের মধ্যে আছড়ে পড়ল প্রতিমা। জল ছিটকে উঠে ভিজিয়ে দিল বালকের মাথা-বুক। তার পাশে দাঁড়িয়ে পাড়ারই এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বিড়বিড় করে বলে উঠলেন , “সম্বৎসর ব্যতীতে তু পুনরাগমনায় চ। আবার ফিরে আসিস মা!”

স্রোতের টানে ক্রমশ ঘাটের থেকে দূরে, মাঝনদীর দিকে ভেসে যাচ্ছে প্রতিমা। হ্যাজাকের সবুজ আলোর বৃত্তে ধরা পড়েছে প্রতিমার সেই অনিন্দ্যসুন্দর মুখ। বালক বিশ্বাস করে প্রতিমার ওই টানা টানা চোখ সত্যিই জলে ভরে ওঠে, ঠিক যেভাবে ভরে উঠেছে তার নিজের দু চোখ।

অন্ধকার নদীর বুকে বিলীয়মান ওই প্রতিমার মুখ আর শূন্য প্যান্ডেলে পুড়তে থাকা একলা দুর্গাপ্রদীপ বালকের মনে এক পাকাপাকি ছাপ ফেলে যায়। ওই দুই দৃশ্য শূন্যতার, বিরহের এমনকি পুনর্জন্মেরও objective correlative হয়ে তার চেতনায় বাসা বাধে। সে নাস্তিক হয়ে বেড়ে ওঠে কী আস্তিক হয়ে সেটা বড় কথা নয়। ওই মুহূর্তেই সে আদিম এক অনুভূতিতে দীক্ষিত হয়, যে অনুভূতি থেকে গুহামানব গুহার দেয়ালে ছবি আঁকত, জীবননান্দ কবিতা লিখতেন কিম্বা ঘনিয়ে উঠত আমারকর্ডের কুয়াশা।

কোন পাপে পরশুদিন বিকেলের দিকে বাবুঘাটে গিয়েছিলাম জানি না। গিয়েছিলাম আসলে দূরপাল্লার বাসের টিকিট কাটতে। কী মনে হল, ভাবলাম দেখে আসি তো আজকালকার বিসর্জন কীরকম। ওঃ, চোখ জ্বলে গেল। একি বিসর্জন না ভ্যান্ডালিজম? ঘাট আর বার্জের মধ্যে ফুট বিশেক জল। সেই জলের মধ্যে একবার করে ঠাকুরগুলোকে চুবিয়ে, পরক্ষণেই বার্জের ক্রেন দিয়ে টেনে তোলা হচ্ছে ডাম্পারের খোলে। মড়মড় করে ভেঙে পড়ছে কাঠামো। ঠাকুরের নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে পড়ছে। আড়চোখে দুপাশে তাকালাম। হ্যাঁ, তারাও রয়েছে, সেই কমবয়সি বাচ্চাগুলো। কিন্তু তাদের চোখে জল নেই, কষ্ট রয়েছে। মা-কে মার খেতে দেখার কষ্ট।

ভাবি, কত কারখানার বর্জ্য রোজ গঙ্গায় পড়ছে, কত মিউনিসিপ্যালিটির ড্রেন। চোরের দায়ে ধরা পড়ল সারা বছরের এই কটা ঠাকুর! তাও যাদের শরীরের নব্বইভাগই মাটি কাঠ খড় আর পাটের মতন নিরীহ বায়ো-ডিগ্রেডেবল জিনিস দিয়ে তৈরি। কিছু কেমিক্যাল রং থাকলেও তারা দূষিত করছে গঙ্গার কতটুকু স্রোত? কলকাতা থেকে মোহনা এই একশো কিলোমিটারই তো? তার বেশি তো নয়? বছরে কটা দিন? বড়জোর চারটে?

হে শোভনবাবু, মহান পৌরপিতা! হে সুভাষবাবু, মাননীয় সবুজমানুষ! আমাদের জীবনে সুন্দরের আনাগোনা বড় কম। মহান বেদনা বলতে গেলে তো কিছুই নেই। আমরা মাগছেলের জন্যে রোজ একঘটি কাঁদি, কিন্তু ঈশ্বরীর জন্যে বছরে ওই এক-দু দিনই । আপনারা দয়া করে আমাদের নদীর বুকে ভেসে যাওয়া প্রতিমাগুলিকে ফিরিয়ে দিন। ওই দৃশ্য না দেখলে আমাদের ছেলেপুলেগুলো বড় হয়ে ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচ্যুডের মানে বুঝতে পারবে না যে।

সৈকত মুখোপাধ্যায়

https://www.facebook.com/saikat.mukherjee.5891

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *